[gtranslate]

বাঙালিরা বরণ করবে বৈশাখ


প্রাচেস্টা নিউজ প্রকাশের সময় : এপ্রিল ১৩, ২০২৩, ৭:১৫ অপরাহ্ণ / ২০
বাঙালিরা বরণ করবে বৈশাখ

 ‌‌-:চিত্রশিল্পী মিলন বিশ্বাস :

বাংলা নববর্ষ দিনটি সকল বাঙালী জাতির ঐতিহ্যবাহী বর্ষবরণের দিন হিসেবে পালন করে থাকে।এবারে ১৪৩০ বঙ্গাব্দ আমরা সবাই বরণ করবো পুরাতন সব ভুলে গিয়ে।বাংলা মাসের প্রথম শুরু হয় বৈশাখ মাস থেকে।তাই প্রথম দিনকে পহেলা বৈশাখ বলে আনন্দে মেতে উঠি বাংলা গানে বাউল রূপে,পান্তা ইলিশ খেয়ে বাঙালি সাজে সবে।যদিও পান্তা ইলিশ খেয়ে সবাই পহেলা বৈশাখ টি পালন করতে চায়। আর সেই সুযোগে মাছ ব্যবসায়ীরা দ্বিগুণ অর্থ নিয়ে ইলিশ মাছ বিক্রি করে বাঙ্গালীদের কাছে। আমার দৃষ্টিতে এটি একটি ভুল প্রথা কারণ বৈশাখ মাসে প্রতিটা মাছের পেটে অসংখ্য ডিম দেখতে পাওয়া যায়। সৃষ্টিকর্তার শ্রেষ্ঠ জীব মানুষ। তাই মানুষ হয়ে জীবকে নষ্ট না করে ইলিশ খাওয়া বন্ধ করি। কারণ একটি মা ইলিশ বেঁচে থাকলে অসংখ্য ইলিশের জন্ম দেবে।আপনি আমি আসুন প্রতিজ্ঞা করি এই ভুল প্রথা থেকে পান্থা ইলিশ না খেয়ে  হৃদয়ে ধারণ করি নতুন বছরকে।  হাজার প্রাণের বিনিময়ে এই মাতৃভাষা অর্জন। তাই হৃদয়ে স্থান দিয়ে মাতৃভাষার সম্মান বজায় রেখে দিনটি আমরা পালন করার চেষ্টা করব সবে। আমি একজন বাঙালি সন্তান, ছবি প্রেমী মানুষ পেশায় চিত্রশিল্পী চিন্তা-ভাবনা দেশ নিয়ে দেশের ইতিহাস নিয়ে।দুঃখ একটাই এর সমাধান জানি না তবুও লিখে যাই মনের আকাঙ্ক্ষা থেকে। হাজার রক্তের বিনিময়ে অর্জিত হলো এই দেশের ভাষা তবে আমরা কেন ইংরেজি মাসকে গননা করে সমস্ত কার্যক্রম পালন করে থাকি।কোথাও একটি অনুষ্ঠানে গিয়ে দেখি তার পিছনে ব্যানার ঝুলানো থাকে সেখানেও থাকে ইংরেজি  মাসের তারিখটি। আমি এই কথা প্রকাশ করায় অনেকে হয়তো বলবেন বেশি বোঝা পাবলিক ।তাতে আমার কিছু আসে যায় না। আমি এমন কোন কিছু বলিনি যেটা শুনে আপনি হাসবেন। আমি সত্যটাকে সৎ সাহস নিয়ে দেখার চেষ্টা করছি। যদি আমার এই লেখাটি কোন দেশ পরিচালনা কমিটির কর্মকর্তা পড়ে থাকেন তবে অবশ্যই আপনার অবস্থান থেকে সরকারের কাছে দাবি রাখবেন। বলবেন একজন চিত্রশিল্পীর মনের কষ্ট তুলে ধরছেন তার লেখায়।আমার নাম চিত্রশিল্পী মিলন বিশ্বাস আমি শিশুদের ভালোবাসি শিশুদের নিয়েই সময় কে অতিবাহিত করি। তাই খুলনার প্রাণকেন্দ্রে ছোট্ট একটা প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করি যার নাম খুলনা  আর্ট একাডেমি‌। আমি ভুল বললাম কিনা বিবেচনা করবেন যদি আমরা বাঙালি হই,যদি বাংলা ভাষার জন্য যুদ্ধ করে থাকি, যদি এই বাংলা ভাষার জন্য হাজার মানুষের প্রাণ এর বিনিময় হয়ে থাকে তবে কেন আমরা ইংরেজি মাসকে সব জায়গায় ব্যবহার করি।আমার প্রতিষ্ঠানে বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি ইচ্ছুক শিক্ষার্থীরা আসে। মাঝেমধ্যে ভাইবা নিয়ে থাকি।ভাইবাতে জানতে চাই আজ বাংলা কত তারিখ? কি মাস চলে? তারা বলতে পারেনা। তখন খুবই দুঃখ পাই এই কি আমাদের বাংলা ভাষা। এই ভাষার জন্য কত মা সন্তান হারিয়েছে। হারিয়েছে সংসার তবে কেন এই যুদ্ধ হয়েছিল এটাই আমার প্রশ্ন।আসুন আমরা নববর্ষ সম্পর্কে কিছু জানি।লেখাটা শেষ পর্যন্ত পড়বেন আশা করি আপনি নতুন কিছু জানতে পারবেন।আমি ছোট থেকে সংরক্ষণ করার চেষ্টা করি এবং আমি আর্ট কলেজে পড়ুয়া স্টুডেন্ট। আর্ট কলেজে বা চারুকলায় যারা পড়ে তারাই নববর্ষ কে নতুন রূপে তুলে ধরার চেষ্টা করে।সেই নববর্ষ সম্পর্কে আমরা একটু জানব সবে।বাংলাদেশ এবং ভারতের পশ্চিমবঙ্গে নববর্ষ বিশেষ উৎসবের সাথে পালিত হয়। ত্রিপুরায় বসবাসরত বাঙালিরাও এই উৎসবে অংশ নিয়ে থাকে। সে হিসেবে এটি বাঙালিদের একটি সর্বজনীন লোকউৎসব হিসাবে বিবেচিত।গ্রেগরীয় বর্ষপঞ্জি অনুসারে বাংলাদেশের প্রতি বছর ১৪ই এপ্রিল এই উৎসব পালিত হয়। বাংলা একাডেমী কর্তৃক নির্ধারিত আধুনিক বাংলা পঞ্জিকা অনুসারে এই দিন নির্দিষ্ট করা হয়েছে। আমি একজন বাঙালি বাংলার ঐতিহ্য জানার দরকার এবং আমি একজন চিত্রশিল্পী। ইতিহাস এবং ঐতিহ্য নিয়ে আমার কাজ। ছাত্রজীবন থেকে খুলনা আর্ট কলেজে ২০০২ সাল থেকে নিজেকে যুক্ত করলাম বৈশাখকে বরণ করা, নানান কর্মকাণ্ড নবীনদের মাঝে তুলে ধরা শিল্পীদের কাজ।২০০৩ সাল থেকে  আমার স্বপ্নে গড়া প্রতিষ্ঠান খুলনা আর্ট একাডেমি থেকে মঙ্গল শোভাযাত্রা নগরীর অলিগলিতে নানান সাজে সেজে থাকে আমার শিক্ষার্থীরা। কেউ লালন, কেউ গায়ের বধু, আদিম মানুষ, কৃষক,জেলে, কলের গান, ঢেঁকি, পোলো, অসংখ্য মুখোশ, হারিয়ে যাওয়া ঐতিহ্য নিয়ে নগরে ঘুরে ঘুরে সবাইকে আনন্দ দেওয়া এবং নিজেরাও নতুন বছরকে বরণ করা কত যে আনন্দের। যারা এই নববর্ষ নিয়ে কাজ করে তারাই জানে। আমরা পহেলা বৈশাখ সম্পর্কে যে তথ্য নবীনদের দিয়ে থাকি সবাই একটু জানবো। পশ্চিমবঙ্গে চান্দ্রসৌর বাংলা পঞ্জিকা অনুসারে ১৫ই এপ্রিল পহেলা বৈশাখ পালিত হয়। এছাড়াও দিনটি বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের সরকারি ছুটির দিন হিসেবে গৃহীত। বিভিন্ন পর্যায়ের ব্যবসায়ীরা দিনটি নতুনভাবে ব্যবসা শুরু করার উপলক্ষ হিসেবে বরণ করে নেয়।এই উৎসবটি শোভাযাত্রা, মেলা, পান্তাভাত খাওয়া, হালখাতা ইত্যাদি বিভিন্ন কর্মকান্ডের মধ্য দিয়ে উদযাপন করা হয়। বাংলা নববর্ষের ঐতিহ্যবাহী শুভেচ্ছা বাক্য হল “শুভ নববর্ষ”। নববর্ষের সময় বাংলাদেশে মঙ্গল শোভাযাত্রার আয়োজন করা হয়। ২০১৬ সালে, ইউনেস্কো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক আয়োজিত এই উৎসব শোভাযাত্রাকে “মানবতার অমূল্য সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য” হিসেবে ঘোষণা করে। পহেলা বৈশাখ রাত ১২ টা থেকে শুরু না হয়ে সূর্যোদয় থেকে শুরু এ নিয়ে ভিন্নমত রয়েছে, ঐতিহ্যগত ভাবে সূর্যোদয় থেকে বাংলা দিন গণনার রীতি থাকলেও ১৪০২ বঙ্গাব্দের ১লা বৈশাখ থেকে বাংলা একাডেমী এই নিয়ম বাতিল করে আন্তর্জাতিক রীতির সাথে সামঞ্জস্য রাখতে রাত ১২.০০টায় দিন গণনা শুরুর নিয়ম চালু করে। এখন যেমন নববর্ষ নতুন বছরের সূচনার নিমিত্তে পালিত একটি সার্বজনীন উৎসবে পরিণত হয়েছে, এক সময় এমনটি ছিল না। তখন নববর্ষ বা পহেলা বৈশাখ উৎসব তথা ঋতুধর্মী উৎসব হিসেবে পালিত হত। তখন এর মূল তাৎপর্য ছিল কৃষিকাজ, কারণ প্রাযুক্তিক প্রয়োগের যুগ শুরু না হওয়া পর্যন্ত কৃষকদের ঋতুর উপরই নির্ভর করতে হত।মুঘলদের থেকে উদ্ভব তত্ত্ব সম্পাদনা কয়েকজন ঐতিহাসিক বাংলা দিনপঞ্জি উদ্ভবের কৃতিত্ব আরোপ করেন ৭ম শতকের রাজা শশাঙ্কের উপর। পরবর্তীতে মুঘল সম্রাট আকবর এটিকে রাজস্ব বা কর আদায়ের উদ্দেশ্যে পরিবর্তিত করেন। আকবরের সময়কাল থেকেই পহেলা বৈশাখ উদ্‌যাপন শুরু হয়। তখন প্রত্যেককে বাংলা চৈত্র মাসের শেষ দিনের মধ্যে সকল খাজনা, মাশুল ও শুল্ক পরিশোধ করতে বাধ্য থাকত। এর পর দিন অর্থাৎ পহেলা বৈশাখে ভূমির মালিকরা নিজ নিজ অঞ্চলের অধিবাসীদেরকে মিষ্টান্ন দ্বারা আপ্যায়ন করতেন। এ উপলক্ষে বিভিন্ন উৎসবের আয়োজন করা হত। এই উৎসবটি একটি সামাজিক অনুষ্ঠানে পরিণত হয় যার রূপ পরিবর্তন হয়ে বর্তমানে এই পর্যায়ে এসেছে। তখনকার সময় এই দিনের প্রধান ঘটনা ছিল একটি হালখাতা করা।  হালখাতার দিনে দোকানদাররা তাদের ক্রেতাদের মিষ্টান্ন দিয়ে আপ্যায়ন করে থাকে। বঙ্গাব্দ শব্দটি (বাংলা বছর) আকবরের সময়কালের কয়েক শত বছর পূর্বে দুটো শিব মন্দিরেও পাওয়া যায়, যা বলছে বাংলা দিনপঞ্জির অস্তিত্ব আকবরের সময়ের পূর্বেও ছিল।আবার এও অস্পষ্ট যে আকবর বা হুসেন শাহ এর দ্বারা এটি গৃহীত হয়েছিল কিনা। বাংলা দিনপঞ্জি ব্যবহারের রীতি আকবরের পূর্বে হুসেন শাহ এর দ্বারাই হয়ে থাকতে পারে।নীতিশ সেনগুপ্ত বলেন, বাংলা দিনপঞ্জির প্রচলন যিনিই করে থাকুন না কেন, ঐতিহ্যবাহী বাংলা দিনপঞ্জির উপর ভিত্তি করে বসন্তের ফসল সংগ্রহের পর রাজস্ব আদায়ের জন্য এটা সহায়ক ছিল, কারো পক্ষে আসলে নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয় কখন এবং কীভাবে এসব নাম পরিবর্তিত হয়ে বৈশাখ, জ্যৈষ্ঠ, আষাঢ়, শ্রাবণ, ভাদ্র, আশ্বিন, কার্তিক, অগ্রহায়ণ, পৌষ, মাঘ, ফাল্গুন ও চৈত্র হয়। অনুমান করা হয়, বারোটি নক্ষত্রের নাম নিয়ে পরবর্তীকালে নামকরণ করা হয় বাংলা মাসের। বিশাখা নক্ষত্র থেকে বৈশাখ, জায়ীস্থা থেকে জ্যৈষ্ঠ, শার থেকে আষাঢ়, শ্রাবণী থেকে শ্রাবণ, ভদ্রপদ থেকে ভাদ্র, আশ্বায়িনী থেকে আশ্বিন, কার্তিকা থেকে কার্তিক, আগ্রায়হন থেকে অগ্রহায়ণ, পউস্যা থেকে পৌষ, ফাল্গুনী থেকে ফাল্গুন এবং চিত্রা নক্ষত্র থেকে চৈত্র।আধুনিক নববর্ষ উদযাপনের খবর প্রথম পাওয়া যায় ১৯১৭ সালে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে ব্রিটিশদের বিজয় কামনা করে সে বছর পহেলা বৈশাখে হোম কীর্তন ও পূজার ব্যবস্থা করা হয়। এরপর ১৯৩৮ সালেও অনুরূপ কর্মকান্ডের উল্লেখ পাওযা যায়।কিন্তু বাংলাদেশে ১৯৬৬ সালে মুহম্মদ শহীদুল্লাহ এর নেতৃত্বে গঠিত হওয়া ১৯৬৬ সালের একটি কমিটিতে পুরনো বাংলা দিনপঞ্জিকে সংশোধিত করা হয়। এখানে প্রথম পাঁচ মাসকে ৩১ দিন, আর বাকি মাসগুলোকে ৩০ দিন বানানো হয়। প্রতি অধিবর্ষে ফাল্গুন মাসে ৩১ দিন ধার্য করা হয়।এমন করে চলছে আজও। আপনারা সকলে আমার লেখার মাঝে ভুল ত্রুটি ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন। সকল মানবজাতির জন্য নববর্ষের শুভেচ্ছা জানিয়ে লেখাটি শেষ করছি। লেখাটি পড়ার জন্য ধন্যবাদ।।

লেখক পরিচিতিঃচিত্রশিল্পী মিলন বিশ্বাস 

প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক 

খুলনা আর্ট একাডেমি

তারিখঃ০৮-০৪-২০২৩