[gtranslate]

ফারজানা কেন ছাদ থেকে লাফ দিলো? প্রশ্ন সাংবাদিকদের


প্রাচেস্টা নিউজ প্রকাশের সময় : জানুয়ারি ১৬, ২০২৩, ৫:১১ অপরাহ্ণ / ২০
ফারজানা কেন ছাদ থেকে লাফ দিলো? প্রশ্ন সাংবাদিকদের

সম্পাদকীয় পাতা থেকে নেওয়া।

ছোট করে প্রকাশ হয়েছে খবরটা। তেমন কোনও সাড়াও পড়েনি, হয়নি আলোচনাও। মুহূর্তেই ঘটনা ভুলে গেছে সবাই। তবে যার গেছে সে কি ভুলেছে, ভুলতে পারছে সব?

বলছিলাম ফারজানার কথা। যে ১১ জানুয়ারি, বুধবার মধ্য দুপুরে ছাদ থেকে লাফিয়ে পড়ে মারা গেছে। কোনও প্রেমঘটিত বিষয় নয়, পারিবারিক জটিলতা বা কাজের জায়গা থেকে নিগৃহীত হয়ে নয়, স্রেফ ভয়ে সে লাফিয়ে পড়েছে বহুতল ভবনের ছাদ থেকে। ভয়টা পুলিশের।

ফারজানার বাড়ি খুলনার বটিয়াঘাটা এলাকায়। বয়স মাত্র ১৯। স্বামীর সঙ্গে সে থাকতো ঢাকার খিলক্ষেতে। যেদিন সে ছাদ থেকে লাফিয়ে পড়ে সেদিন ছিল তার কাজে যাওয়ার প্রথম দিন। মুদি দোকানদার স্বামী জানেও না বাসা থেকে বের হওয়া সুস্থ স্বাভাবিক মেয়েটি মাত্র ২ ঘণ্টার ব্যবধানে মারা গেছে।

ফারজানা একা ছাদ থেকে সেদিন লাফিয়ে পড়েছে তা নয়, তার সঙ্গে ছিল আরও একজন। রিয়া আক্তার, যার বয়স ২২। সৌভাগ্যক্রমে সে বেঁচে গেছে। প্রশ্ন হলো– মৃত্যু নিশ্চিত জেনেও কেন তারা লাফ দিলো?

আমি জানি অনেকেরই মন এখন বলছে– যেহেতু ‘স্পা সেন্টার’, তাই নিশ্চয়ই খারাপ কিছু ধরা পড়বে। এই জন্যই সে লাফ দিয়েছে। অনেকেই এসব ভাববেন। কারণ, আমরা গল্প, নেতিবাচক গল্প আর রসালো গল্প খুবই ভালোবাসি। আমরা মাথা খাটিয়ে কি ভাবি– কী সম্ভব আর কী নয়?

অনৈতিক কিছু করার জন্য প্রথম দিন কাজ যোগ দেওয়া মেয়েটি সেখানে ছিল, এটি ভাবাও যায় না। ‘স্পা সেন্টার’ সম্পর্কে সবার যে নেতিবাচক ধারণা তাও যে সঠিক নয় তা জানাও সহজ।

তাহলে প্রশ্ন হলো– অভিযান কেন তাহলে? অভিযান ছিল আবাসিক ভবনে বাণিজ্যিক অফিস খোলার বিষয়ে। এসব কারণে তাদের কিছুই হতো না। তবু তারা লাফিয়েছে। কারণ, পুলিশ ধরার চেয়ে মৃত্যু তাদের কাছে সহজ মনে হয়েছে।

এতটা ভয় কেন পেতে হবে পুলিশকে? সাহস নিয়ে যখন এই প্রশ্ন জাগে তখন খুব দূরে যেতে হয় না। চট করেই মনে পড়ে বুশরার নাম। বুশরা, যাকে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয়েছে বুয়েট শিক্ষার্থী ফারদিনের বান্ধবী হিসাবে। স্রেফ সন্দেহের বশে এই মেয়েটিকে জেলে থাকতে হয়েছে প্রায় ২ মাস।

মামলার প্রধান আসামি করা হয়েছে তাকে। বন্ধুর মৃত্যুতে সে কাঁদেনি, এই অভিযোগ তার বিরুদ্ধে। তাকে মামলার প্রধান আসামি করেছে ফারদিনের পরিবার। এই অভিযোগ পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সর্বোচ্চ ত্বরিতগতিতে কোনও প্রাথমিক তদন্ত ছাড়াই তাকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। কেবল রিমান্ডই নয়, ২১ বছরের বুশরাকে সবার সামনে দিয়ে জেলে নিয়ে যাওয়া হলো। মেয়েটার জীবন, ভবিষ্যৎ সব অন্ধকার করে দেওয়া হলো কোনও অকাট্য প্রমাণ ছাড়াই। প্রশ্ন হলো, কেন তাকে এভাবে নিয়ে যাওয়া হলো?

ফারদিন আত্মহত্যা করেছে। তদন্ত কর্মকর্তারা এমনই বললেন। তাহলে বুশরার জীবন কেন অন্ধকারাচ্ছন্ন হলো, কেন তাকে হেয় করা হলো? এই যে তাকে খুনির তকমা দেওয়া হলো, এর দায় তাহলে কার?

এমন উদাহরণ তো আছে অনেক। ‘স্পা সেন্টারে’ ২ তরুণী কোন মামলায় ফেঁসে যাবে, কোন অপরাধে সাজা হয়ে যাবে জানাও যাবে না। এই অসম্মান আর এই ভীতির চেয়ে ছাদ থেকে লাফিয়ে পড়া তাদের কাছে সহজ মনে হয়েছে। যে পুলিশ আশ্রয় হওয়ার কথা, আমাকে নিরাপদ অনুভূতি দেওয়ার কথা, তাদের আমরা কি ভয় পেয়েই যাবো? কবে এমন দিন আসবে পুলিশ তার কার্যক্রম চালানোর আগে ভাববে- একজন নিরপরাধ মানুষের জীবন যাতে বিপন্ন না হয়? আসবে সেই দিন? অপরাধ না করেও যদি আতঙ্ক নিয়ে চলতে হয়, তবে আমি কি মানুষ, নাকি আজন্ম অপরাধী?

 

লেখক: সাংবাদিক